মার্কিন সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা এখন নাজুক অবস্থানে পৌঁছেছে। এর ধারাবাহিকতায় যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি ঋণও এখন দ্রুতগতিতে বাড়ছে। সরকারি ঋণ ও জিডিপি অনুপাতে এখন ইতালি ও গ্রিসকেও ছাড়িয়ে যেতে চলেছে যুক্তরাষ্ট্র। চলতি দশকের শেষ নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি ঋণ ও জিডিপি অনুপাত দাঁড়াবে রেকর্ড ১৪৩ দশমিক ৪ শতাংশে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সর্বশেষ পর্যবেক্ষণে এমন পূর্বাভাস উঠে এসেছে। খবর এফটি।
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ২০৩০ সাল পর্যন্ত বার্ষিক গড় বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৭ শতাংশের ওপরে থাকবে। এ হার আইএমএফের নিয়মিত পর্যবেক্ষণে থাকা উন্নত দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।
ইতালি ও গ্রিসের সরকারি অর্থনৈতিক কাঠামোর দুর্বলতা সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অর্থনীতিবিদদের মনযোগ ব্যাপক মাত্রায় আকর্ষণ করে এসেছে। ইউরোজোনে ২০১০–২০১২ সালে দেখা দেয়া ঋণসংকটের কেন্দ্রে ছিল দেশদুটি। এর মধ্যে গ্রিসকে পরে আইএমএফ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের তত্ত্বাবধানে বেইলআউট ও ঋণ পুনর্গঠন করতে হয়। দুটি দেশই এখন বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এতে চলতি দশকের শেষ নাগাদ দুই দেশেই সরকারি ঋণ ও জিডিপির অনুপাত কমে আসবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এর বিপরীতে চলতি দশকের পুরো সময় জুড়ে যুক্তরাষ্ট্রে ঋণ-জিডিপি অনুপাত বাড়তেই থাকবে। দেশটির যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসের (CBO) আশঙ্কা, এ ধারা আগামী কয়েক দশক অব্যাহত থাকবে।
অ্যামুন্ডি ইনভেস্টমেন্ট ইনস্টিটিউটের গ্লোবাল ম্যাক্রো বিভাগের প্রধান মাহমুদ প্রধান বলেন, ‘এটি এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত। সিবিওর পূর্বাভাস বলছে, ধারাবাহিক বাজেট ঘাটতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ বাড়তেই থাকবে। আবার ইতালিতে ঋণ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় দুর্বল। তার মানে এই নয় যে ইতালি ঝুঁকিমুক্ত হয়ে গেছে।’
বিশ্বব্যাপী এখনো প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা ডলার। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ গ্রহণের সক্ষমতা ইউরোপীয় দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। আইএনজি ব্যাংকের যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অর্থনীতিবিদ জেমস নাইটলি বলেন, ‘অনেক মার্কিন রাজনীতিক ও বিনিয়োগকারী ইউরোপের ধীর প্রবৃদ্ধি ও দুর্বল অর্থনীতিকে কিছুটা খাটো করে দেখেন। তবে তাদের আলোচনার ধরন বদলে যায়, যখন এ ধরনের পরিসংখ্যান সামনে আসে।’
বাইডেন প্রশাসনের সময় যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল বাজেট ঘাটতি দ্রুত বেড়েছে। যদিও বেকারত্ব ছিল নিম্ন পর্যায়ে। আর ট্রাম্প্র প্রশাসন এখনো সমস্যাটি সমাধানে তেমন কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলে আইএমএফের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
বরং ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কিছুটা আত্মতুষ্টির ছাপ দেখা যাচ্ছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা জো ল্যাভরয়ানা সম্প্রতি বলেন, ‘একটি বিষয় কারো চোখে পড়ছে না। আর সেটি হলো এ বছরের যুক্তরাষ্ট্রে আর্থিক ঘাটতি পরিস্থিতির যে উন্নতি হয়েছে, তার বড় অংশেরই সূচনা হয়েছে এপ্রিলে। ট্রাম্প প্রশাসন ব্যয় কমানো ও আমদানি শুল্ক বাড়ানোর মাধ্যমে রাজস্ব বৃদ্ধিতে অগ্রগতি অর্জন করেছে।’
তবে যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি ঋণের মোট দায় থেকে মোট সম্পদ বাদ দিয়ে নিট সরকারি ঋণ হিসাব করে দেখা গেছে, চলতি দশক শেষে যুক্তরাষ্ট্রে নিট সরকারি ঋণ ও জিডিপির অনুপাত ইতালির তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশীয় পয়েন্ট নিচে থাকবে।
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৮ সালের পর থেকে ইতালির নিট ঋণের বোঝা কমতে শুরু করবে। তবে গ্রিসের নিট ঋণ নিয়ে সংস্থাটি কোনো পূর্বাভাস দেয়নি।
ইতালি দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল জিডিপি প্রবৃদ্ধির কারণে ঋণের চাপ কমাতে হিমশিম খাচ্ছে। আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইতালির সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি হবে মাত্র দশমিক ৫ শতাংশ এবং ২০২৬ সালে হবে দশমিক ৮ শতাংশ।
দেশটির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের বাজেট ঘাটতি কমানোর উদ্যোগ বিদেশী বিনিয়োগকারীদের প্রশংসা পেয়েছে। ২০২২ সালে দেশটিতে বাজেট ঘাটতির হার ছিল জিডিপির ৮ দশমিক ১ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা ৩ শতাংশে নামানো সম্ভব হবে।
আর যুক্তরাষ্ট্রে এ হার কিভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে, সে বিষয়ে এখনো সংশয় রয়ে গেছে। থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠান পিটারসন ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ জো গ্যানিয়ন বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অচলাবস্থা অত্যন্ত গভীর। যে দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, দেশটি এ বিপুল পরিমাণ বাজেট ঘাটতি কীভাবে কমাবে, তা কল্পনা করা বেশ কঠিন। ডেমোক্র্যাটরা ব্যয় কমাতে চায় না, রিপাবলিকানরা কর বাড়াতে চায় না। দুই দলই নিজেদের অবস্থানে অনড়। এ স্থবিরতা কবে ভাঙবে, বলা মুশকিল।’